যারা রোজা ভাঙতে পারবেন, যাদের জন্য শিথিলযোগ্য
প্রাপ্ত বয়স্ক প্রত্যেক মানব সন্তানের ওপর রমাদানের রোজা রাখা ফরজ। আল্লাহ তা’লা বলেছেন, তোমাদের যে রমজান মাস পাবে সে যেন অবশ্যই সিয়াম পালন করে। (সূরা বাকারা-১৮৫)
তবে যারা সফরে আছেন এবং যারা অসুস্থ তাদের বেলায় রোজা না রাখার অনুমতি রয়েছে। অবশ্য নির্দিষ্ট সময় পর তাদের রোজা কাযা করতে হবে। তবে অনিরাময়যোগ্য জটিল রোগে আক্রান্তরা রোজার বিপরীতে ফিদইয়া প্রদানের মাধ্যমে রোজা থেকে দায়মুক্তি পাবেন।
গর্ভবতী নারীদের বিধান
কেউ কেউ অসুস্থ থাকেন, বিশেষ করে নারীদের মধ্যে কেউ কেউ সদ্য ভূমিষ্ট সন্তানকে দুধ পান করাচ্ছেন, কেউ আছেন গর্ভবতী। তাদের রোজার বিধান কেমন হবে?
আল্লাহ তা’লা বলেছেন, ‘আর যে লোক অসুস্থ কিংবা মুসাফির অবস্থায় থাকবে সে অন্য দিনে গণনা পূরণ করবে। আল্লাহ তোমাদের জন্য সহজ করতে চান; জটিলতা কামনা করেন না।’ -সূরা বাকারা : ১৮৫
অর্থাৎ স্তন্যদানকারী দুধ পান না করালে সন্তান ক্ষতিগ্রস্ত হবে, গর্ভবতী মা খাদ্য গ্রহণ না করলে তিনি অসুস্থ হয়ে যেতে পারেন, গর্ভের সন্তান ঝুঁকিতে পড়ে যেতে পারে। এ ধরনের আশঙ্কা দেখা দিলে সেসব মায়েরা রোজা রাখবেন না।
তাহলে তাদের রোজার বিধান কেমন হবে? তারা কী ফিদইয়া দেবেন? নাকি পরবর্তীতে রোজা রাখবেন?
ফিদইয়া গ্রহণযোগ্য নয়
এক্ষেত্রে ইসলামের নির্দেশনা হলো, অবশ্যই তারা পরবর্তীতে রোজা রাখবেন। তারা ফিদইয়া দিলে গ্রহণযোগ্য হবে না। কারণ আশা করা যায়, তারা দ্রুতই সুস্থ হয়ে যাবেন। অথবা সন্তান বড় হয়ে গেলে আর দুধ পান করাতে হবে না। তখন তারা তাদের রোজাগুলো রাখবেন।
এ রকম পরিস্থিতিতে পড়ে গেলে পর পর দুই বছর রোজা রাখবেন না। সন্তানকে দুধ পান করানোর প্রয়োজন মিটে গেলে রোজাগুলো কাযা করে নেবেন। একইভাবে গর্ভবতী মায়েরাও ঝুঁকি অনুভব করলে রোজা রাখবেন না। সন্তান প্রসব ও দুধপানের সময় শেষ করার পরের বছরগুলোতে রোজা রাখবেন।
আনাস ইবনে মালেক (র.) বর্ণিত হাদীসে রাসুল (স.) আমাদেরকে এমন বার্তাই দিয়েছেন। তিনি বলেন, আল্লাহ তাআলা মুসাফিরের রোজা ও অর্ধেক নামাজ হ্রাস করে দিয়েছেন আর গর্ভবতী ও দুগ্ধদানকারিণী মহিলাদের রোজা (পরবর্তীতে কাজা করার শর্তে) মাফ করে দিয়েছেন। (সুনানে তিরমিজি, হাদিস : ৭১৫)।
ইসলাম সহজ জীবন বিধান। স্বভাবজাত ধর্ম। আল্লাহ বলেছেন, ‘তিনি তোমাদের জন্য সহজ করতে চান, কঠিন করতে চান না।’ তিনি অন্যত্র বলেছেন, ধর্মের মধ্যে কোনো কাঠিন্য নেই।
রাসুল (স.) বলেছেন, কেউ যদি দ্বীনকে কঠিন করতে চায়, তাহলে এই দ্বীনই তাকে পরাজিত করবে। কাজেই দ্বীনকে সহজ করুন, সহজভাবে অনুসরণ করুন।
রোগীদের রোজার বিধান
কোনো অবস্থায় রোজা পরিত্যাগ করা যায় না। কেউ বিনা কারণে ইচ্ছাকৃতভাবে রোজা ভাঙলে এর কাফফারা তিনি কখনোই দিয়ে শেষ করতে পারবেন না। আল্লাহ তা’লা আমাদের সবাইকে রোজার রাখার তাওফিক দান করুন।
আল্লাহ তা’লা বলেছেন, হে ঈমানদারগণ! তোমাদের উপর রোজা ফরয করা হয়েছে, যেরূপ ফরজ করা হয়েছিল তোমাদের পূর্ববর্তী লোকদের উপর, যেন তোমরা খোদাভীরুতা অর্জন করতে পার।
-(সূরা আল বাক্বারাহ: ১৮৩)
দৈহিক এ বিধানটি অবশ্য পালনীয় হলেও আল্লাহ তা’লা কারও কারও রোজা রাখার বিষয়ে ছাড় দিয়েছেন। এর মধ্যে যারা অসুস্থ তারা রোজার বিধানের আওতাভুক্ত নয়। অসুস্থতার অনেক ধরন আছে। কোনো যুবক অসুস্থ হলে আশা করা যায় কিছু দিন পর তিনি সুস্থ হবেন। আবার এমন অনেকেই আছেন যারা বৃদ্ধ, সেই সঙ্গে তিনি অসুস্থ। আবার এমনও হয় যে, রোগী বৃদ্ধ নন, তবে অসুস্থতা এতো গুরুতর যে, যা সেরে যাওয়ার মতো না। সে সকল ব্যক্তির জন্য রোজার বিধান কী?
আল্লাহ তা’লা বলেছেন, ‘তোমাদের মধ্যে যারা পীড়িত বা ভ্রমণে থাকবে, তারা অন্য সময়ে তা এর সমপরিমাণ সংখ্যায় পূর্ণ করবে। আর যাদের রোজা পালনের সামর্থ্য নেই, তারা এর পরিবর্তে ফিদ্ইয়া দেবে একজন মিসকিনের খাবার। (সূরা আল বাকারা: ১৮৪)
আয়াতের দুটি অংশের ব্যাখ্যা হলো, যে রোগী আল্লাহ চাইলে সুস্থ হয়ে যাবেন এবং রোজা রাখার মতো সক্ষমতা ফিরে পাবেন, তিনি সুস্থ হওয়ার পর রোজা কাযা করে নেবেন। এর বিপরীতে তিনি ফিদইয়া দিলে গ্রহণযোগ্য হবে না। কিন্তু কোনো জটিল রোগী, তিনি বৃদ্ধ কিংবা যুবক হোন—যার স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসা অসম্ভব, তারা তাদের প্রতি দিনের রোজার বিপরীতে একজন মিসকিন ফিদইয়া (একজনের এক দিনের খাবারের সমান) প্রদান করবেন।
ডায়াবেটিস রোগীদের রোজার বিধান
ডায়াবেটিস রোগীদের ইনসুলিন গ্রহণ করতে হয়। কখনো তাদের শরীরে সুগারের স্তর পরীক্ষা করতে হয়। তাদের অবস্থা এমন হয়ে যায় যে, তাৎক্ষণিকভাবে খাবার গ্রহণ না করলে তারা বড় ধরনের স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়তে পারেন। এ অবস্থায় তাদের করণীয় কী?
এক্ষেত্রে আমাদের মনে রাখতে হবে আল্লাহ তা’লা আমাদের জন্য দ্বীনকে (ইসলাম) সহজ করে দিয়েছেন।
ইনসুলিন গ্রহণ করতে পারবেন
অনিবার্য পরিস্থিতিতে ডায়াবেটিস রোগীরা ইনসুলিন গ্রহণ করতে পারবেন। কারণ ইনসুলিন কোনো খাবার নয়। মনে রাখতে হবে রোজাবস্থায় আমাদেরকে পানাহার ও স্বামী-স্ত্রীর দৈহিক মিলন নিষেধ করা হয়েছে। সুতরাং যেই বস্তু খাদ্যের কাজ করে কেবলমাত্র সেগুলো গ্রহণ থেকে বিরত থাকতে হবে। খাবার স্যালাইন কিংবা এমন ওষুধ, যার মাধ্যমে খাদ্যের ঘাটতি পূরণ হবে, সেটি গ্রহণ করা যাবে না। কারণ রোজার মাহাত্মই হলো ক্ষুধার যন্ত্রণা অনুভব করা। ফলে এ রমাদানে আপনি দান-সাদাকা করবেন, হতদরিদ্রের পাশে দাঁড়াবেন ইত্যাদি। আর রোজার উপকারি তো বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণিতই।
সুতরাং রোজাবস্থায় ডায়াবেটিস রোগী ইনসুলিন গ্রহণ করতে পারবেন। ইনসুলিন আগে-পরে সুগারের স্তর কম বেশি হয়ে গেলো কিনা, তা পরীক্ষা করতে হয়। সেক্ষেত্রে রক্ত নেওয়ার প্রয়োজন হয়ে পড়ে। ব্লাড দিলে অথবা নিলে রোজার ভাঙবে না। এমনকি রোজাবস্থায় আপনি রক্ত দানও করতে পারবেন, তাতেও সমস্যা নেই। এমনকি কেটে যাওয়া বা আঘাতের কারণে শরীর থেকে রক্ত ঝরলেও রোজা ভাঙবে না। মানুষ মনে করেন, রক্ত বের হলেই রোজা ভেঙে যাবে, এটা ভুল ধারণা। হ্যাঁ, প্রচুর রক্তক্ষরণের কারণে শরীর দুর্বল কিংবা বেহুঁশ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা দেখা দিলে, অথবা জীবন বিপন্ন হলে রোজা ভেঙে খাবার গ্রহণ করবেন। অথবা অন্য কোনো চিকিৎসা পদ্ধতি গ্রহণ করা যাবে, স্বাভাবিক সময়ে যা গ্রহণ করলে রোজা ভেঙে যেতো।
সুতরাং সেটা ইনসুলিন, সুগারের স্তর পরীক্ষা, রক্ত দান কিংবা পরীক্ষা করার জন্য রক্ত বের হলে হলে রোজা ভাঙবে না।
কখন রোজা ভাঙতে পারবেন?
এ ছাড়া কোনো ডায়াবেটিস রোগীর সুগারের মাত্রা অনেক কমে গেছে, অথবা বেড়ে গেছে—তাৎক্ষণিকভাবে চিকিৎসা প্রদান করা না হলে জীবন ঝুঁকিতে পড়ে যাবে, তখন তিনি খাদ্য গ্রহণ করতে পারবেন, রোজা ভাঙতে পারবেন।
আল্লাহ তা’লা জীবন রক্ষায় আমাদেরকে অনুমতি প্রদান করেছেন। তিনি বলেছেন, সীমা লঙ্ঘন বা তাঁর বিধান প্রত্যাখ্যান করার মানসিকতা ছাড়া একান্ত বাধ্য হয়ে কারও দ্বারা কিছু ঘটে গেলে গুনাহ হবে না। সুতরাং জীবন রক্ষার্থে যিনি রোজা ভাঙতে বাধ্য হয়েছেন, এতে তার কোনো পাপ হবে না। এক্ষেত্রে পরবর্তীতে শুধু একটি রোজা কাজা করলেই হবে।
এ ছাড়া চরম মাত্রার ডায়াবেটিস রোগী, যিনি দীর্ঘ সময় পানাহার ছাড়া থাকতে পারেন না কিংবা জটিল দূরারোগ্য ব্যাধিতে আক্রান্ত ব্যক্তি রোজার বিপরীতে ফিদইয়াহর বিধানের অন্তর্ভুক্ত হবেন।
অধ্যাপক মোখতার আহমাদ
পরিচালক, ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগ, ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি